All posts
BengaliComedySatirePoliticalShort Story

গণেশবাবুর গুপ্ত কবিতা

উনিশশো সত্তরের কলকাতা: একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, অথচ অস্বস্তিকরভাবে চেনা গল্প (গল্পের সমস্ত চরিত্র, পার্টি ও ঘটনা কাল্পনিক। মিল খুঁজে পেলে সেটা লেখকের দোষ নয়, সময়ের দোষ।)

এক ॥ লাইনের মানুষ

উনিশশো সত্তর সালের কলকাতায় দুটো জিনিস কখনো ফুরোত না: দেয়ালের স্লোগান আর রেশনের লাইন। চাল ফুরোত, ডাল ফুরোত, কেরোসিন ফুরোত, মাঝে মাঝে সরকারও ফুরিয়ে যেত, কিন্তু লাইন ফুরোত না। লাইন ছিল এ শহরের একমাত্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।

আর সেই লাইনের সম্রাট ছিলেন গণেশচন্দ্র ভট্টাচার্য।

সাতচল্লিশ বছর বয়স, শ্যামবাজারের ফণীভূষণ লেনের দেড়খানা ঘরের ভাড়াটে, ন্যাশনাল জুট অ্যান্ড টুইন কোম্পানির টাইপিস্ট। বাঁকুড়ার এক গণ্ডগ্রাম থেকে বাইশ বছর আগে কলকাতায় এসেছিলেন কিছু একটা হবেন বলে। কিছু একটা হয়েছিলেন বটে: লাইনে দাঁড়ানোর জাতীয় স্তরের প্রতিভা।

গণেশবাবু ভোর সাড়ে চারটেয় উঠে রেশনের লাইনে দাঁড়াতেন। লাইনে দাঁড়িয়েই দাঁত মাজতেন, লাইনে দাঁড়িয়েই খবরের কাগজের হেডলাইন পড়তেন (পুরো কাগজ কেনার সামর্থ্য ছিল না, পাশের লোকের কাগজের উল্টো পিঠ পড়তেন, এতে তাঁর উল্টো করে পড়ার এমন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল যে সোজা খবর পড়লে বিশ্বাস হত না)। পাড়ার লোকে বলত, গণেশবাবুকে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে যেকোনো জায়গায় ছেড়ে দিলে উনি প্রথমে খুঁজবেন লাইনটা কোথায়, তারপর খুঁজবেন নিজে কোথায়।

তাঁর স্ত্রী শৈলবালা ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ। গণেশবাবু যেখানে জীবনকে মেনে নিয়েছিলেন, শৈলবালা সেখানে জীবনের সঙ্গে রোজ সকালে এক দফা দর-কষাকষি করতেন এবং প্রায়ই জিততেন। তাঁর জিভখানা এমন ধারালো ছিল যে পাড়ার লোকে বলত, শৈলবৌদিকে দিয়ে বঁটি শানানো যায়।

আর ছিল গণেশবাবুর টাইপরাইটার।

অফিসের সেই বাংলা রেমিংটন যন্ত্রটির বয়স গণেশবাবুর চাকরির চেয়েও বেশি। তার ক্যারেজের স্প্রিং ভাঙা: চার-পাঁচটা শব্দ টাইপ করলেই লাইনটা নিজে থেকেই শেষ হয়ে যেত, নতুন লাইনে নামতে হত। আর 'র' অক্ষরের হাতলটা বেঁকে গিয়েছিল বলে প্রতিটি 'র' ছাপা হত লাইনের চেয়ে একটু উঁচুতে, যেন অক্ষরটা লাফ দিয়ে পালাতে চাইছে।

বড়বাবু বহুবার বলেছিলেন, "ওটা সারাও, গণেশ।"

গণেশবাবু বলতেন, "স্যার, ও যন্ত্র নয়, ও আমার সহকর্মী। ওরও তো বয়েস হয়েছে।"

আসল কথা, সারাতে সাড়ে সাত টাকা লাগত।

কে জানত, এই ভাঙা স্প্রিং আর লাফানো 'র'-ই একদিন গোটা কলকাতা কাঁপিয়ে দেবে।


দুই ॥ দেয়ালের আবির্ভাব

শ্রাবণ মাসের এক ভেজা সকালে ফণীভূষণ লেনের মোড়ে, পুরনো ছেঁড়া পোস্টারের ওপর, নতুন একটা কাগজ সাঁটা দেখা গেল।

টাইপ করা। অসমান লাইনে। তাতে লেখা:

চাল নেই। ডাল নেই। কেরোসিন: বাকি। সরষের তেল: আধ পোয়া, তা-ও ভেজাল। লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই জীবন গেল। নকুড়ের গুদোমে সব আছে, আমাদের ভাগ্যে শুধু লাইন। এ লাইন ভাঙতে হবে।

গ. ভ.

প্রথম পড়লেন পাড়ার রকের বিমল। বিমল বি.এ. পাশ, বেকার, এবং সেই কারণেই পাড়ার সবচেয়ে গভীর চিন্তাবিদ। সে তিনবার পড়ল, তারপর সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, "উফ্‌।"

"কী হল রে?" জিজ্ঞেস করল তার সঙ্গী খগেন।

"এটা কবিতা নয় খগেন," বিমল গম্ভীর গলায় বলল, "এটা বিস্ফোরণ। দ্যাখ: 'এ লাইন ভাঙতে হবে।' কোন লাইন? রেশনের লাইন? না রে পাগল। ব্যবস্থার লাইন। শ্রেণির লাইন। ইতিহাসের লাইন! আর দ্যাখ, প্রতিটা পঙ্‌ক্তি অসমাপ্ত। কেন? কারণ আমাদের বিপ্লবও অসমাপ্ত!"

খগেন মাথা নাড়ল। সে কিছুই বোঝেনি, কিন্তু না বোঝাটাই তখন গভীরতার লক্ষণ ছিল।

"আর এই 'র' গুলো দ্যাখ," বিমল আঙুল দিয়ে দেখাল, "প্রতিটা 'র' লাইনের ওপরে উঠে গেছে। অক্ষরগুলো পর্যন্ত শৃঙ্খলা মানছে না! এ লোক অক্ষর দিয়ে বিদ্রোহ লিখেছে!"

"আর 'গ. ভ.' মানে?"

বিমল এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর তার চোখদুটো জ্বলে উঠল।

"গণ বিপ্লব।"

ব্যস। সেই মুহূর্তে, ফণীভূষণ লেনের ভেজা দেয়ালে, জন্ম নিলেন কলকাতার নতুন কিংবদন্তি: কমরেড গণপতি। যাঁকে কেউ কোনোদিন দেখেনি, কিন্তু সবাই চেনে।

তিন দিনের মধ্যে কবিতাটা হাতে-লেখা কপি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল কলেজ স্ট্রিট থেকে যাদবপুর। কফি হাউসের এক টেবিলে জনৈক সমালোচক ঘোষণা করলেন, "এই কবির মধ্যে আমি নাগার্জুন পাচ্ছি, ব্রেশ্‌ট পাচ্ছি, আবার সামান্য জীবনানন্দও পাচ্ছি।" পাশের টেবিল থেকে প্রতিবাদ এল, "জীবনানন্দ? আপনি তো মশাই প্রতিক্রিয়াশীল!" এবং যথারীতি চেয়ার ছোড়াছুড়ির উপক্রম হল। কফি হাউসে তখন মতভেদটাই ছিল একমাত্র ঐকমত্য।

আর পাড়ার রেশন দোকানের মালিক নকুড় দত্ত কবিতাটা পড়ে শুধু বললেন, "আমার নামটা অন্তত পদবি-সমেত লিখতে পারত। শহরে কি নকুড়ের অভাব?"


তিন ॥ ফর্দ

এবার আসল ঘটনাটা বলা যাক। কারণ ইতিহাস যেটা জানে না, পাঠকের সেটা জানার অধিকার আছে।

ঘটনার দিন সাতেক আগে, গণেশবাবু রেশন দোকানে পরপর চারদিন ঘুরে খালি হাতে ফিরেছিলেন। চতুর্থ দিন নকুড় দত্ত ঝাঁপ অর্ধেক নামিয়ে বলেছিলেন, "মাল নেই।" অথচ সেই রাতেই পেছনের গুদোম থেকে তিনটে ঠেলাগাড়ি বোঝাই বস্তা বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল: সবই নাকি "অন্য পাড়ার কোটা।"

বাড়ি ফিরে গণেশবাবু শৈলবালার সামনে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলেছিলেন, "দিল না।"

শৈলবালা তখন উনুনে শেষ কাঠকয়লাটা উসকে দিচ্ছিলেন। মুখ না তুলেই বলেছিলেন, "লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তো জীবনটা গেল, কেরানি। এ লাইন ভাঙতে হবে। বুঝলে? ভাঙতে হবে।"

কথাটা গণেশবাবুর মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। পরদিন অফিসে, টিফিনের ফাঁকা সময়ে, তিনি ঠিক করলেন রেশন অফিসে একটা লিখিত অভিযোগ জমা দেবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ: সহকর্মী টাইপরাইটারে কাগজ লাগিয়ে টাইপ করতে বসলেন। প্রথমে ঘরে কী কী নেই তার ফর্দ, তারপর অভিযোগ, শেষে স্ত্রীর সেই কথাটা, যেটা তাঁর মনে হয়েছিল দরখাস্তের উপযুক্ত "জোরালো সমাপ্তি।"

ভাঙা স্প্রিংয়ের দৌলতে লাইনগুলো ভেঙে ভেঙে গেল। বেঁকা হাতলের দৌলতে 'র'-গুলো লাফিয়ে উঠল। নিচে সই করলেন সংক্ষেপে: গ. ভ.। পুরো নাম লিখতে ভরসা হয়নি; নকুড়ের হাত লম্বা।

তারপর যা হয়। বড়বাবু ডাকলেন, ফাইল চাপা পড়ল, কাগজটা টেবিলে পড়ে রইল। বিকেলে অফিসের পিয়ন হারু সেই কাগজেই নিজের তেলেভাজা মুড়ে বাড়ি নিয়ে গেল। হারুর বাড়ি ফণীভূষণ লেনের মোড়েই। তেলেভাজা শেষ, তেলচিটে কাগজ রাস্তায়। রাতে ঝড়বৃষ্টি। কাগজ উড়ে গিয়ে সেঁটে গেল ভেজা দেয়ালে, ছেঁড়া পোস্টারের ঠিক ওপরে, এমন নিখুঁতভাবে, যেন কোনো অদৃশ্য প্রচার-সম্পাদক নিজের হাতে সাঁটিয়েছে।

ইতিহাসের অর্ধেক ঘটনাই ঘটে এইভাবে। বাকি অর্ধেক ঘটে ব্যাখ্যায়।

গণেশবাবু ব্যাপারটা প্রথম টের পেলেন চারদিন পরে, যখন রকের বিমল তাঁকে রাস্তায় ধরে জিজ্ঞেস করল, "গণেশদা, কমরেড গণপতির কবিতাটা পড়েছেন? পড়তেই হবে। এ জিনিস না পড়লে এ যুগে বাঁচা অন্যায়।"

গণেশবাবু দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফর্দখানা পড়লেন। তাঁর প্রথমে মনে হল মাথা ঘুরছে। তারপর মনে হল, পালাই। তারপর মনে হল: সাড়ে সাত টাকা বাঁচাতে গিয়ে এ কী হল!

তিনি ক্ষীণ গলায় বললেন, "এ তো... মানে... এটা তো কবিতা না-ও হতে পারে। মানে ধরো, কারো... ফর্দ-টর্দ..."

বিমল হাহা করে হেসে উঠল। "ফর্দ! গণেশদা, আপনি পারেনও। আরে এটাই তো টেকনিক: ফর্দের ফর্মে লেখা প্রতিবাদ! সাধারণের ভাষায় অসাধারণ! এই জন্যেই আপনাদের প্রজন্মকে দিয়ে কিস্যু হবে না, চোখের সামনে আগুন দেখলেও বলবেন উনুন।"

গণেশবাবু আর কথা বাড়ালেন না। তিনি জীবনে শিখেছিলেন, লাইন আর তর্ক, দুটোতেই মাঝখানে ঢুকতে নেই।


চার ॥ দুই পার্টি, এক কবি

গোলমালটা জাতে উঠল যখন পার্টিরা নামল।

পাড়ায় তখন দুই পার্টির রাজত্ব: বিপ্লবী জনচেতনা পার্টি (বিজপা) আর প্রগতিশীল গণসংগ্রাম দল (প্রগদ)। মজার কথা, বছর দুয়েক আগে এরা একটাই পার্টি ছিল। তারপর "ঐতিহাসিক পর্যায়ের চরিত্র নির্ধারণ" নিয়ে মতভেদে ভাঙে। তারপর ভাঙা টুকরোগুলো আবার ভাঙে "ভাঙাটা ঠিক হয়েছিল কি না" সেই প্রশ্নে। পাড়ার লোকে বলত, ও পার্টিতে এখন কর্মীর চেয়ে কমিটির সংখ্যা বেশি; মিটিং ডাকলে কোরাম হয় না, কিন্তু বিভাজন ডাকলে হয়।

বিজপা-র পাড়া-নেতা ভবতোষ মিত্র প্রথম দান মারলেন। কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা, গলায় সবসময় আধখানা উদ্ধৃতি। ভবতোষবাবুর বিশেষত্ব ছিল তিনি বিখ্যাত লোকেদের উদ্ধৃতি দিতেন, তবে কখনোই ঠিকঠাক নয়। "মার্ক্স বলেছেন, ধর্ম হল জনগণের আলুর দম", এই ধরনের। কেউ শুধরে দিলে বলতেন, "মূল জার্মানে ওরকমই আছে।" পাড়ায় জার্মান-জানা কেউ ছিল না, তাই ভবতোষবাবু অপরাজেয় ছিলেন।

এক সন্ধ্যায় ভবতোষ মিত্র রকে এসে ঘোষণা করলেন, "কমরেড গণপতি আমাদের লোক। ওঁর কবিতায় বিজপা-র লাইন স্পষ্ট।"

পরদিনই প্রগদ-র নেতা অনাদি হালদার পাল্টা সভা করে বললেন, "গণপতি আমাদের। 'এ লাইন ভাঙতে হবে'। এখানে লাইন মানে পরিষ্কার বিজপা-র রাজনৈতিক লাইন। কবি ওদের লাইন ভাঙতে বলেছেন!"

ব্যাখ্যার এমন মার-প্যাঁচ দেখে স্বয়ং কবিতাটাও বোধহয় দেয়ালে লজ্জা পেয়েছিল।

এরপর শুরু হল কলকাতার সবচেয়ে অদ্ভুত টানাটানি: এক অদৃশ্য মানুষকে নিয়ে দুই পার্টির দড়ি-টানাটানি, যেখানে দড়িটাও কাল্পনিক। বিজপা দেয়াল লিখল: "কমরেড গণপতি, তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার পেছনে!" প্রগদ তার পাশেই লিখল: "গণপতি একা নন, আমরাও পেছনে!" এক রসিক রাতের অন্ধকারে নিচে লিখে গেল: "ভদ্রলোকের সামনে তাহলে কে?"

আর গণেশবাবু? তিনি প্রাণপণে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু বিধাতার রসিকতার শেষ ছিল না। যতবার কেউ তাঁর সামনে গণপতির প্রসঙ্গ তুলত, ততবার তিনি ঘেমে-নেয়ে বলতেন, "আমি... মানে... ও লোক হয়তো কেউই নয়। হয়তো ও লোকের অস্তিত্বই নেই।"

আর লোকে মুগ্ধ হয়ে ভাবত: আহা, কী গভীর কথা! গণপতি ব্যক্তি নন, গণপতি একটা ধারণা!

গণেশবাবুর প্রতিটি অস্বীকার তাঁর অজান্তেই গণপতির মিথে নতুন ইট গাঁথছিল। তিনি যত বলেন "কিছু না", লোকে তত শোনে "সব কিছু।" শহরটার তখন এমনই কান।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার শুরু হল এর পরে। দেয়ালে নতুন কবিতা পড়তে লাগল। একই ভাঙা লাইন, একই লাফানো 'র', নিচে সেই: গ. ভ.।

ভাত চেয়েছিলাম, পেলাম ভাষণ। ভাষণে বড় তেল, অথচ রেশনে তেল নেই, এই হল আমাদের ভোজবাজির শাসন।

গণেশবাবু কবিতাটা পড়ে দেয়াল ধরে ফেললেন। এ তিনি লেখেননি। শপথ করে বলতে পারেন, লেখেননি। তাহলে কে? তাঁর ভাঙা টাইপরাইটার কি রাতে একা একা টাইপ করছে? তেত্রিশ কোটি দেবতার এই দেশে সেটাও কি অসম্ভব?

সেই রাতে তিনি শৈলবালাকে প্রায় বলেই ফেলেছিলেন সব। কিন্তু শৈলবালা তখন নতুন কবিতাটা মুখস্থ বলছিলেন পাশের বাড়ির ননীবালাকে: "শুনছ দিদি, 'ভাষণে বড় তেল, অথচ রেশনে তেল নেই', উফ, লোকটা যেন আমার পেটের কথাটি টাইপ করে দিয়েছে!"

গণেশবাবু ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলেন। "পেটের কথা টাইপ করা"-র অভিযোগে স্বামীরা ধরা পড়লে সংসারে ঠিক কী কী হয়, তা ভেবে ওঠার সাহস তাঁর হল না।


পাঁচ ॥ লালবাজারের কবি

লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগে "গণপতি ফাইল" খুলল শ্রাবণের শেষে। তদন্তের ভার পড়ল সাব-ইন্সপেক্টর প্রণব কুণ্ডুর ওপর।

প্রণব কুণ্ডু মানুষটা পুলিশে বেমানান ছিলেন, যেমন বেমানান ডালের বাটিতে রসগোল্লা। কর্তারা বলতেন, "কুণ্ডু বড় ভাবুক।" সহকর্মীরা বলত, "কুণ্ডুদা কেস ফাইলেও মার্জিন ছেড়ে লেখে, যেন পরে টীকা লিখবে।"

কুণ্ডু কাজে নামলেন। দেয়াল থেকে কবিতাগুলোর কপি জোগাড় করলেন, ম্যাগনিফাইং গ্লাস নিয়ে বসলেন, আর দশ মিনিটের মধ্যেই তাঁর চোখ আটকে গেল সেই লাফানো 'র'-এ।

এই 'র' তিনি চেনেন।

বাঁকুড়ার স্কুলে তাঁর সহপাঠী ছিল এক রোগা, মুখচোরা ছেলে: গণেশ। ম্যাট্রিকের পর গণেশ কলকাতায় চলে যায়, চিঠি লিখত অফিসের টাইপরাইটারে। সেই চিঠির প্রতিটি 'র' এমনি লাফাত। কুণ্ডু তখন হাসতেন, "তোর যন্ত্রটা তো তোর চেয়ে চঞ্চল রে!"

আর একটা কথা। স্কুলে কবিতা লিখত কে? গণেশ নয়। লিখতেন প্রণব কুণ্ডু নিজে। পুরস্কারও পেয়েছিলেন: "প্রভাতী" পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তাঁর 'শালিকের সংসার'। তারপর বাবা মারা গেলেন, সংসার ঘাড়ে পড়ল, কবিতার খাতা ট্রাঙ্কের তলায় চলে গেল, আর প্রণব কুণ্ডু ঢুকলেন পুলিশে, যেখানে ছন্দ বলতে শুধু লাঠির।

কুণ্ডু এক রবিবার সাদা পোশাকে ফণীভূষণ লেনে গেলেন। দূর থেকে দেখলেন: রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে সেই রোগা মুখচোরা মানুষটা, বাইশ বছরে আরও রোগা, আরও মুখচোরা। যাঁকে গোটা শহর ভাবছে আগ্নেয়গিরি, তিনি আসলে লাইনের নিরীহতম নুড়িপাথর।

কুণ্ডুর সব বোঝা হয়ে গেল। ফর্দ, তেলেভাজা, ঝড়। পুরো তদন্তে তাঁর লেগেছিল ছ'দিন। রিপোর্ট লিখতে বসলেন: "অভিযুক্ত কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি নহে। প্রচারিত 'কবিতা' প্রকৃতপক্ষে একটি গার্হস্থ্য অভিযোগপত্র, দৈবক্রমে..."

এই পর্যন্ত লিখে কুণ্ডু থামলেন।

লিখলে কী হবে? কেস ক্লোজ। গণপতি শেষ। শহরের দেয়ালগুলো আবার শুধু "এখানে প্রস্রাব করিবেন না"-য় ফিরে যাবে। আর ট্রাঙ্কের তলার সেই খাতাটা... সেটার কী হবে?

সাব-ইন্সপেক্টর প্রণব কুণ্ডু রিপোর্টটা ছিঁড়ে ফেললেন। নতুন কাগজে লিখলেন: "তদন্ত চলিতেছে। অভিযুক্ত অত্যন্ত ধূর্ত। সময় প্রয়োজন।"

আর সেই রাতে, কোয়ার্টারের ঘরে হ্যারিকেনের আলোয়, তেইশ বছর পর, প্রণব কুণ্ডু আবার কবিতা লিখলেন। থানার পুরনো টাইপরাইটারের 'র'-এর হাতলটা তিনি নিজের হাতে সামান্য বেঁকিয়ে নিলেন। শিল্পের খাতিরে এটুকু সরকারি সম্পত্তির অপচয় ক্ষমার্হ। নিচে সই করলেন: গ. ভ.।

হ্যাঁ, পাঠক। দ্বিতীয় কবিতাটা ("ভাত চেয়েছিলাম, পেলাম ভাষণ") এবং তার পরের প্রতিটি গণপতি-কবিতা লিখছিলেন যে মানুষটি, তিনি সেই পুলিশ, যাঁর ওপর ভার ছিল গণপতিকে ধরার। শহরের সবচেয়ে ওয়ান্টেড কবিকে খুঁজছিল যে রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারীই ছিলেন কবি। তদন্তকারী নিজেই আসামি। এমন সুবিধেজনক তদন্ত পৃথিবীতে কমই হয়েছে; তদন্তে অগ্রগতি নেই বলে ওপরওয়ালারা যখন ধমকাতেন, কুণ্ডু গম্ভীর মুখে বলতেন, "স্যার, লোকটা সব সময় আমার এক পা আগে আগে চলছে।" মিথ্যে তো নয়: নিজের চেয়ে এক পা আগে থাকা যায় না, এইটুকুই যা সমস্যা।


ছয় ॥ ময়না পাখির গান

কুণ্ডুর ডবল জীবন দিব্যি চলছিল, গোল বাধাল একটা পুরনো খাতা।

লালবাজারে "সোর্স রেজিস্টার" বলে একখানা খাতা থাকে: কোন পাড়ায় পুলিশের খোচর কে, তার সাংকেতিক হিসেব। গণপতি-তদন্তের সুবাদে কুণ্ডুর হাতে এল ফণীভূষণ লেন অঞ্চলের পাতাটা। সেখানে জ্বলজ্বল করছে এক সোর্সের সাংকেতিক নাম: "ময়না"। মাসোহারা: পঁয়ত্রিশ টাকা। কাজ: "স্থানীয় রাজনৈতিক গতিবিধির নিয়মিত খবর।"

ময়নার আসল পরিচয়ের জায়গায় লেখা: ভবতোষ মিত্র, বিজপা।

কুণ্ডু চেয়ারে হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ হাসলেন। যে ভবতোষ মিত্র রকে দাঁড়িয়ে গলা ফাটান "পুলিশি রাষ্ট্রের দালালদের চিনে রাখুন!", তিনি নিজেই মাসে পঁয়ত্রিশ টাকার দালাল। যিনি সভায় বলেন "আমার বুকে গুলি করুন, খবর পাবেন না!", তিনি প্রতি বুধবার খবর দিয়ে যান, রসিদে টিপসইসহ। বিপ্লবের এমন কারবারি যুগে যুগে থাকে: এক হাতে মশাল, অন্য হাতে মাসোহারা, আর মুখে বলে দুটোই জনগণের স্বার্থে।

মজা আরও ছিল। ময়নার রিপোর্টগুলো পড়ে কুণ্ডু দেখলেন, ভবতোষ পুলিশকে নিয়মিত "গণপতির গতিবিধি" জানাচ্ছেন, সবই বানানো। "গণপতি সম্ভবত দমদমে আত্মগোপন করিয়াছে", "গণপতির সহিত বহিরাগত শক্তির যোগ থাকিতে পারে"। যত ভুয়ো খবর, তত টাকা। অর্থাৎ ভবতোষ মিত্র পার্টির মঞ্চে গণপতিকে বেচছেন জনতার কাছে, আর থানার খাতায় গণপতিকে বেচছেন পুলিশের কাছে। এক মাল, দুই বাজার। ব্যবসাবুদ্ধি থাকলে বিপ্লবেও লক্ষ্মী আসেন।

কুণ্ডু পাতাটা যত্ন করে টুকে রাখলেন। কাজে লাগবে। কবিদের হাতে প্রমাণ থাকা ভালো: ছন্দ মিলুক না মিলুক, হিসেব মেলে।


সাত ॥ দাঁড়িপাল্লার মালিক

এদিকে নকুড় দত্তের গুদোমে এক সন্ধ্যায় দুটি আলাদা বৈঠক বসল: সন্ধে ছ'টায় আর সাড়ে সাতটায়। মাঝে দেড় ঘণ্টার ব্যবধান রাখা হয়েছিল যাতে এক পার্টি বেরোনোর সময় অন্য পার্টির মুখ দেখতে না হয়। ভদ্রতা বলে একটা ব্যাপার আছে তো।

ছ'টার বৈঠকে এলেন বিজপা-র ভবতোষ মিত্র। পুজোর চাঁদার রসিদ বইয়ের আড়ালে খামে গেল পাঁচশো টাকা। সাড়ে সাতটায় এলেন প্রগদ-র অনাদি হালদার। তাঁর খামেও পাঁচশো। নকুড় দত্ত ন্যায্য লোক, দুই বিপ্লবে সমান বিনিয়োগ করতেন।

গুদোমের অন্ধকারে বসে নকুড় সেদিন তাঁর ভাগ্নেকে ব্যবসার দর্শন বোঝাচ্ছিলেন।

"বুঝলি নন্তু, লোকে ভাবে আমি চাল-ডালের ব্যবসা করি। ভুল। আমি করি অভাবের ব্যবসা। চাল তো গুদোমে পচেই, দাম বাড়ে অভাবে। আর অভাব জিনিসটা টিকিয়ে রাখতে গেলে চাই গরম বাজার: মিছিল, বন্‌ধ, বোমা। দোকান বন্ধ থাকলে যেটুকু খোলা থাকে, সেটা আমার, আর দামটাও আমার। তাই দুই পার্টিকেই খাওয়াই। ডান হাতে দিই, বাঁ হাতে দিই। মাঝখানে দাঁড়িপাল্লাটা আমার।"

"আর এই গণপতি?" নন্তু জিজ্ঞেস করল। "লোকটা তো মামা তোমার নাম করেই কবিতা লিখেছে!"

নকুড় হাসলেন। বাজারে জিলিপির রস যেমন ধীরে গড়ায়, তেমনি হাসি।

"ওরে, ওটাই তো মজা। লোকটা লিখল 'নকুড়ের গুদোমে সব আছে', আর গোটা শহর জেনে গেল, নকুড়ের গুদোমে সব আছে! এর চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়? আগে খদ্দের জিজ্ঞেস করত মাল আছে কি না, এখন জিজ্ঞেস করে দাম কত। বিশ্বাসটা কবি করে দিয়ে গেছে, আমি শুধু দামটা বলি। ও কবিতা আমার বিরুদ্ধে না রে, ও আমার সাইনবোর্ড। শত্রুকে টাকা দিয়ে পুষলে সে বিজ্ঞাপন হয়ে যায়। এই হল ব্যবসার প্রথম সূত্র।"

নন্তু মুগ্ধ চোখে মামাকে দেখল। কলকাতার সব কলেজ মিলে যা শেখাতে পারেনি, এই গুদোমঘর তা এক সন্ধ্যায় শিখিয়ে দিল: আন্দোলন যারই হোক, তহবিল একজনেরই থাকে। মঞ্চে যত পার্টিই উঠুক, উইংসের পর্দাটা টাঙানো থাকে মহাজনের পেরেকে।

আর তাই, "এ লাইন ভাঙতে হবে" স্লোগানে যখন পাড়া কাঁপছে, লাইনটা তখন আরও লম্বা হচ্ছিল, কারণ লাইন ভাঙার আন্দোলনের খরচ জোগাচ্ছিলেন সেই মানুষ, লাইন যাঁর রুজি।


আট ॥ দেশবন্ধু পার্কের সন্ধ্যা

আশ্বিনের গোড়ায় দুই পার্টি এমন এক কাণ্ড করল যার তুলনা মেলা ভার: গণপতিকে নিয়ে টানাটানির মীমাংসায় তারা যুক্ত জনসভা ডাকল। শহর জুড়ে পোস্টার: "ঐতিহাসিক গণ-সমাবেশ! কমরেড গণপতি স্বয়ং উপস্থিত থাকিবেন!"

কবির অনুমতি কেউ নেয়নি, কারণ কবির ঠিকানা কেউ জানত না। দুই পার্টিরই ভরসা ছিল: এত বড় ডাক শুনে গণপতি নিশ্চয়ই আসবেন, আর মঞ্চে উঠে তাদের দিকটায় দাঁড়াবেন। মঞ্চটা সেইমতো বানানোও হয়েছিল: বাঁদিকে বিজপা-র চেয়ার, ডানদিকে প্রগদ-র, মাঝখানে একটা ফাঁকা চেয়ার, তাতে সাদা কাপড়ে লেখা: "কবির আসন।" ফাঁকা চেয়ারটাই হয়ে উঠল শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান আসবাব: যে বসে নেই, তার দিকেই সবাই তাকিয়ে।

সভার দিন দেশবন্ধু পার্ক লোকে লোকারণ্য। ঝালমুড়িওয়ালারা এসেছে, পকেটমাররা এসেছে, গোয়েন্দারা এসেছে সাধারণ মানুষ সেজে, সাধারণ মানুষ এসেছে। তারা অবশ্য কিছু সাজেনি, সেই ভুলটা তারা করেই থাকে।

ভিড়ের মধ্যে ছিলেন গণেশবাবুও। না এসে উপায় ছিল না: শৈলবালা স্বয়ং আসবেন বলে গোঁ ধরেছিলেন। "যে লোকটা আমার মনের কথা লেখে, তাকে একবার চোখে দেখব না?" গণেশবাবু স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন, পৃথিবীতে এর চেয়ে জটিল পরিস্থিতিতে কোনো বাঙালি স্বামী পড়েছে কি না, সন্দেহ।

মঞ্চে ভাষণ চলছিল। ভবতোষ মিত্র বলছিলেন, "লেনিন বলেছেন, কবিরাই হল বিপ্লবের কামানের গোলা—" (লেনিন এ কথা কস্মিনকালেও বলেননি, কিন্তু লেনিনও সভায় উপস্থিত ছিলেন না।) অনাদি হালদার পাল্টা মাইক টেনে বলছিলেন, "গণপতি আমাদের, কারণ আমাদের দলিলের বাহান্ন নম্বর পাতায়—"

ঠিক তখনই পার্কের উত্তর কোণে পরপর দুটো পেটো ফাটল।

কে ফাটাল, কেন ফাটাল, সে তর্ক আজও মেটেনি। বিজপা বলে প্রগদ, প্রগদ বলে বিজপা, পুলিশ বলে "দুষ্কৃতী", দুষ্কৃতীরা কিছু বলে না। সত্তরের কলকাতায় পেটোর পিতৃপরিচয় জিজ্ঞেস করাটাই ছিল বোকামি। মোদ্দা কথা, ভিড়ে হুড়োহুড়ি লাগল, ধাক্কাধাক্কিতে জনতার স্রোত মঞ্চের দিকে গড়াল, এবং সেই স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেল গণেশচন্দ্র ভট্টাচার্যকে, সোজা মঞ্চের সিঁড়িতে।

কে যেন চেঁচাল, "ওই তো! উনিই উঠছেন! গণপতি! কমরেড গণপতি এসেছেন!"

জনতার যুক্তি বড় সরল: মঞ্চে যে ওঠে, সে নিশ্চয়ই ওঠার লোক। মুহূর্তে হাজার গলা: "গণপতি জিন্দাবাদ! জিন্দাবাদ!"

গণেশবাবু মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। হাঁটু কাঁপছে, ধুতির কোঁচা হাতে জড়ানো। তিনি একবার ভিড়ের দিকে তাকালেন, আর দেখতে পেলেন সামনের সারিতে শৈলবালার মুখ। সে মুখে বিস্ময়, আর তার নিচে চাপা, অনিবার্য একখানা প্রশ্ন জমছে।

বাইশ বছরের সংসারে গণেশবাবু একটা জিনিস শিখেছিলেন: শৈলবালার সামনে মিথ্যে টেকে না। অতএব জীবনে প্রথমবার, হাজার মানুষের সামনে, গণেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সত্যি কথাটা বললেন।

"আমি... আমি কবি নই।" গলা কাঁপছিল, কিন্তু মাইক দয়ালু যন্ত্র: কাঁপা গলাকেও গমগমে করে দেয়। "আমি কেরানি। টাইপিস্ট। ওই যে লেখাটাকে আপনারা কবিতা বলছেন, ওটা কবিতা নয়। ওটা আমার সংসারের ফর্দ। চাল ছিল না, ডাল ছিল না, কেরোসিন বাকি ছিল। আমি রেশন অফিসে নালিশ করব বলে টাইপ করেছিলাম। ব্যস। এইটুকুই। গোটাটাই একটা মুদির ফর্দ!"

দেশবন্ধু পার্ক স্তব্ধ। এত বড় জমায়েতে এত গভীর নীরবতা কলকাতা কমই দেখেছে।

তারপর, ভিড়ের মাঝখান থেকে, কফি হাউস থেকে আসা এক তরুণ সমালোচক গর্জে উঠলেন:

"শুনলেন?! শুনলেন আপনারা?! উনি বললেন গোটাটাই একটা মুদির ফর্দ! গোটা দেশটাকে উনি মুদির ফর্দ বললেন! আমরা সবাই ফর্দের আইটেম: কেউ চাল, কেউ ডাল, কেউ বাকির খাতায়! এ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রূপক! আর 'আমি কবি নই, আমি কেরানি', এ তো ঘোষণাপত্র! উনি বলছেন এ দেশে কবিদেরও কেরানি বানিয়ে ছেড়েছে ব্যবস্থা!"

এক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপর পার্ক ফেটে পড়ল:

"ফর্দ নয়, বিপ্লব চাই!" "কেরানি থেকে কবি, গণপতি! গণপতি!"

গণেশবাবু মাইক ধরে আরও কিছু বলার চেষ্টা করলেন, "না না, আপনারা বুঝছেন না, সত্যিই ফর্দ—" কিন্তু ততক্ষণে স্লোগানের সমুদ্রে তাঁর গলা ডুবে গেছে। মানুষটা সারাজীবনে ওই একবারই সম্পূর্ণ সত্যি কথা জনসমক্ষে বলেছিলেন, এবং শহর সেটাকেই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা ধরে নিল। সত্যের এমন পরাজয় মিথ্যেও কখনো ঘটাতে পারেনি।

বিজপা আর প্রগদ, দুই পার্টিই পরদিন প্রেস বিবৃতি দিল, "কমরেড গণপতির ঐতিহাসিক ফর্দ-তত্ত্ব আমাদেরই দলিলের সম্প্রসারণ।" ভবতোষ মিত্র বললেন, "মার্ক্স বলেছেন, ইতিহাস প্রথমবার আসে ফর্দ হিসেবে, দ্বিতীয়বার কবিতা হিসেবে।" এবারও কেউ যাচাই করল না।

আর ভিড়ের পেছনে, পুলিশের পোস্টিং-এ দাঁড়িয়ে, সাব-ইন্সপেক্টর প্রণব কুণ্ডু চোখ মুছলেন। পাশের কনস্টেবল জিজ্ঞেস করল, "স্যার, কাঁদছেন?"

"ধুলো," কুণ্ডু বললেন। "এ শহরে বড় ধুলো, বুঝলে। চোখে পড়লে বেরোতে চায় না।"


নয় ॥ শেষ মোচড়টি ঘরের

সে রাতে ফণীভূষণ লেনের দেড়খানা ঘরে হ্যারিকেনের আলোয় মুখোমুখি বসলেন গণেশবাবু আর শৈলবালা।

অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। শেষে গণেশবাবুই ভাঙলেন, মিনমিনে গলায়, "তুমি... তুমি কি রাগ করলে? আমি তো কাউকে বলিনি... মানে বলতে গিয়েছিলাম, ওরা শুনলই না..."

শৈলবালা স্বামীর দিকে তাকালেন। সে দৃষ্টিতে রাগ ছিল না। ছিল অন্য কিছু, যেটাকে ঠিক করুণা বলা যায় না, প্রশ্রয়ও না; দুটোর মাঝামাঝি, বাইশ বছরের পুরনো একটা ভাব।

"রাগ করব কেন," তিনি শান্ত গলায় বললেন। "শুধু একটা হিসেব বুঝে নিই। ফর্দটা তুমি টাইপ করেছিলে, না?"

"হ্যাঁ..."

"চাল নেই, ডাল নেই, কেরোসিন বাকি: এসব আমি রোজ সকালে তোমায় মুখে মুখে বলি, না?"

"হ্যাঁ..."

"আর শেষ লাইনটা? যেটা শুনে শহর পাগল হল? 'লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই জীবন গেল। এ লাইন ভাঙতে হবে', ওটা কার মুখের কথা, কেরানি?"

গণেশবাবু চুপ।

"উনুনের সামনে বসে আমি বলেছিলাম। তুমি শুধু টুকে নিয়ে গিয়ে টাইপ করেছ।" শৈলবালা উঠে দাঁড়িয়ে আঁচলটা কোমরে জড়ালেন: যুদ্ধজয়ের ভঙ্গিতে নয়, রাতের বাসন মাজার ভঙ্গিতে, যেটা আরও ভয়ংকর। "তাহলে দাঁড়াল কী? কবিতাটা আমার। ছাপাখানাটা তোমার। শহরসুদ্ধ লোক পুজো করছে টাইপরাইটারটাকে, আর যে লিখল সে মাজছে বাসন। এ দেশে ওই নিয়মই বটে।"

দরজার কাছে গিয়ে তিনি একবার ফিরলেন। হ্যারিকেনের আলোয় তাঁর মুখে মুচকি হাসির একটা রেখা।

"তবে ভালোই হয়েছে। নামটা তোমারই থাক। নাম বড় ঝামেলার জিনিস: পুলিশে ধরে, পার্টিতে টানে, লোকে মালা পরায়। আমার অত সময় নেই। ঘরে কাল সকালের চাল নেই। সেই লাইনে আবার আমাকেই দাঁড়াতে হবে।"

গণেশবাবু হ্যারিকেনের দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। বাইরে কারা যেন দেয়ালে নতুন স্লোগান লিখছে, রাত জেগে বিপ্লব হচ্ছে, আর ঘরের ভেতর ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো সত্যটা হ্যারিকেনের মতো টিমটিম করছে: যুগে যুগে বাণী দেন একজন, আর ফলক ওঠে আরেকজনের নামে। এবং ফলকওয়ালা লোকটা সাধারণত জানেই না, তার সবচেয়ে বিখ্যাত লাইনটা সে শুধু টাইপ করেছিল।


উপসংহার ॥ লাইনের শেষে

তারপর যা হয়, তা-ই হল।

শীত পড়তে পড়তে শহরের উত্তেজনা নতুন ইস্যু খুঁজে নিল: নতুন মিছিল, নতুন বন্‌ধ, নতুন দেয়াল। গণপতির কবিতা আসা কমে গেল; শোনা যায়, লালবাজারের এক সাব-ইন্সপেক্টর বদলি হয়ে ব্যারাকপুরে চলে যাওয়ার পর থেকেই নাকি কবির "আত্মগোপন গভীরতর" হয়েছে। ভবতোষ মিত্র জেলা কমিটিতে উঠলেন। পুলিশের খাতায় তাঁর মাসোহারাও উঠল চল্লিশ টাকায়; পদোন্নতি দুই অফিসেই একসঙ্গে হল, এমন সৌভাগ্য ক'জনের হয়। অনাদি হালদারের পার্টি আবার ভাঙল, এবার "গণপতি-প্রশ্নে অবস্থান" নিয়েই। একটা মানুষ যে নেই, তাকে নিয়ে দুটো পার্টি হল; থাকলে না জানি কী হত।

আর নকুড় দত্ত করলেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ব্যবসাটি।

বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, হারু পিয়নকে দশ টাকা দিয়ে, তিনি জোগাড় করলেন আসল কাগজটা: সেই তেলচিটে, বৃষ্টিভেজা, ঐতিহাসিক ফর্দ। বাঁধিয়ে টাঙালেন দোকানের মাথায়, নিচে সাইনবোর্ড:

"কমরেড গণপতির হস্তলিখিত (টাইপকৃত) মূল কবিতা: এই দোকানের মাল লইয়াই রচিত। দর্শন ফ্রি। লাইনে আসুন।"

লোকে এল। দলে দলে এল। রেশন তুলতে নয়, কবিতা দেখতে। "এ লাইন ভাঙতে হবে", এই অমর পঙ্‌ক্তি দর্শনের জন্য নকুড়ের দোকানের সামনে যে লাইন পড়ল, পাড়ার লোকে বলে অত লম্বা লাইন সত্তরের কলকাতাতেও কেউ দেখেনি। লাইন ভাঙার মন্ত্র দেখতে মানুষ লাইন দিল, আর লাইনের ধারে বসল ঝালমুড়ি আর তেলেভাজার নতুন দোকান। সেগুলোরও মালিক নকুড়। বিপ্লব থেকে দর্শনী: মহাজনের খাতায় সবই জমার ঘরে।

আর এক শীতের সকালে, সেই লাইনেই দেখা গেল একজন রোগা, মুখচোরা ভদ্রলোককে। হাতে স্ত্রীর দেওয়া নতুন ফর্দ: মুখে মুখে বলা, তাঁর হাতে টোকা। ভদ্রলোক ধৈর্য ধরে এক পা এক পা এগোচ্ছেন নিজের ফ্রেমবন্দি অমরত্বের দিকে, দেখার জন্য যে জিনিসটা তিনি নিজে লেখেননি, শুধু টাইপ করেছিলেন।

লাইনটা দীর্ঘ ছিল। তবে গণেশবাবুর তাড়া ছিল না।

লাইনে দাঁড়ানোয় তাঁর চেয়ে বড় ওস্তাদ এ শহরে কে-ই বা আছে?

আর পকেটের ফর্দটার একদম শেষে, শৈলবালার মুখের কথা টুকতে গিয়ে, তিনি আজও খেয়াল করেননি, শেষ লাইনটা এবারও ফর্দ ছাড়িয়ে অন্য কিছু হয়ে গেছে:

"যে দোকান কবিতা বেচে, তার লাইনও একদিন ভাঙতে হবে।"

কাগজটা পকেটেই আছে। হাওয়া দিলেই...

॥ সমাপ্ত ॥

Leave a comment

No account needed. Leave the name blank and you'll get a random one.

0/2000
By email

Get the next one in your inbox.

Engineering post-mortems, mathematics, and short fiction, in English and Bengali. Infrequent by design: an email only when there is something new worth reading, never on a schedule. One click to leave, any time.

Double opt-in: you'll get one email to confirm, and nothing else until you do.