All posts
BengaliComedyShort Story

কমিটির দুর্গা

উত্তর কলকাতার দুই পাড়া, এক শরৎকাল: একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, অথচ প্রতি বছর ঘটে যাওয়া গল্প (সমস্ত ক্লাব, কমিটি, পুরস্কার ও প্রোমোটার কাল্পনিক। মিল খুঁজে পেলে সেটা কাকতালীয় নয়, শারদীয়।)

এক ॥ সাতাশির পেনাল্টি

হরিমোহন লেন আর কেষ্ট মল্লিক রো: উত্তর কলকাতার এই দুটো গলির মধ্যে দূরত্ব মেরেকেটে দেড়শো মিটার, আর শত্রুতার বয়স ঊনচল্লিশ বছর।

শুরুটা হয়েছিল উনিশশো সাতাশির এক ফুটবল ম্যাচে। পাড়া টুর্নামেন্টের ফাইনালে হরিমোহন লেনের নবজাগরণ সংঘ বনাম কেষ্ট মল্লিক রো-র অগ্নিবীণা অ্যাথলেটিক ক্লাব। খেলার শেষ মিনিটে রেফারি একটা পেনাল্টি দিয়েছিলেন। কার পক্ষে আর কেন, তা নিয়ে দুই পাড়ায় দুটো সম্পূর্ণ আলাদা মহাকাব্য প্রচলিত। মোদ্দা ঘটনা: গোল হয়েছিল, কাপ গিয়েছিল, রেফারি পালিয়েছিলেন সাইকেলে, এবং সেই সন্ধে থেকে দুই পাড়ার মধ্যে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন।

ফুটবলের বয়স ফুরোয়, শত্রুতার ফুরোয় না। সে শুধু মাঠ বদলায়। নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধটা সরে এল ক্যারাম আর কালীপুজোর মাইকে। আর একুশ শতকে এসে সে পেল তার মহাযুদ্ধের ময়দান:

দুর্গাপুজো।

আজ আর কেউ পেনাল্টির কথা মনে রাখেনি। এখন প্রশ্ন একটাই: কার প্যান্ডেলের লাইন কত দূর গেল। হরিমোহন লেনের লাইন যদি টালা ব্রিজ ছোঁয়, কেষ্ট মল্লিক রো-র লাইনকে শ্যামবাজার পাঁচমাথা ছুঁতেই হবে। পাড়ার প্রতিপত্তি এখন মাপা হয় মানুষের ভোগান্তির দৈর্ঘ্যে: যে-পুজোয় লোকে যত বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে কষ্ট পায়, সে-পুজো তত সার্থক।

মা দুর্গা বছরে চারদিনের জন্য আসেন। দুই কমিটি তাঁর জন্য সারা বছর যুদ্ধ করে। ভক্তির এমন সামরিকীকরণ স্বয়ং অসুরও দেখেননি।


দুই ॥ কমিটি বাহাদুর

নবজাগরণ সংঘের সম্পাদক বটুকেশ্বর ঘোষ, ওরফে বটুদা: বয়স তেষট্টি, পদের বয়স একত্রিশ।

একত্রিশ বছর ধরে প্রতি বছর ক্লাবে নির্বাচন হয়, এবং প্রতি বছর বটুদা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতেন। কারণটা গণতান্ত্রিক: কেউ দাঁড়ায় না। দাঁড়ালে জিততে হবে, জিতলে পুজো করাতে হবে, পুজো করালে হিসেব দিতে হবে, আর হিসেব দিলে পাড়ায় বাস করা যাবে না। বটুদা এই চতুর্মুখী বিপদ একা সামলান বলে পাড়া তাঁকে দেবতার পরের আসনটা দিয়ে রেখেছে।

শ্রাবণের শেষ রবিবার ক্লাবঘরে বসল পুজো কমিটির প্রথম সভা। এজেন্ডা তিনটে: থিম, বাজেট, আর চাঁদা। উপস্থিতি ঊনত্রিশ জন, যাঁদের গড় বয়স আটান্ন, এবং যাঁদের মধ্যে সাতজন ঘুমিয়ে পড়লেন কোরাম ঘোষণার আগেই। নবজাগরণ সংঘের কমিটিতে ঢোকার অলিখিত ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল একটাই: অবসরপ্রাপ্তি। কর্মক্ষম মানুষের এখানে জায়গা নেই; কাজের লোক দিয়ে কমিটি হয় না, কমিটি হয় মতামতের লোক দিয়ে।

সভার প্রথম চল্লিশ মিনিট গেল গত বছরের হিসেব নিয়ে। খরচের তিনটে খাত: "মাইক বাবদ", "ভোগ বাবদ" আর "বিবিধ"। বিবিধ-র অঙ্কটাই সবচেয়ে বড়। ট্রেজারার নরহরিবাবু গম্ভীর মুখে জানালেন, "বিবিধর ভেতরে কী কী আছে, সেটা বিবিধ কারণে বলা যাচ্ছে না।" সভা মেনে নিল। একত্রিশ বছরে সভা সবই মেনে নিতে শিখেছে।

দ্বিতীয় এজেন্ডায় উঠল সেই চিরন্তন প্রশ্ন: থিম, না সাবেকি?

সাবেকিপন্থী প্রবীণেরা বললেন, মায়ের এক চালা, ডাকের সাজ, ঢাক, এই তো পুজো। থিমপন্থীরা বললেন, ও-জিনিসে লাইন হয় না, আর লাইন না হলে কেষ্ট মল্লিক রো-র কাছে মুখ দেখানো যাবে না। শেষ কথা বললেন বটুদা, "সাবেকিয়ানাও এখন একটা থিম। গতবার সল্টলেকের এক পুজো 'সাবেকি ঘরানা' থিম করে সেরা থিমের পুরস্কার পেয়েছে। অর্থাৎ থিম না করেও আর থিমের বাইরে থাকা যাচ্ছে না। অতএব থিমই হবে।"

সভার একেবারে শেষে, দরজার কাছ থেকে একটা তরুণ গলা উঠল, "আমি একটা থিমের প্রস্তাব দিতে পারি?"

গলাটা টুবাইয়ের: বটুদার একমাত্র ছেলে, কলেজ-ফেরত, ছবি আঁকে, রিল বানায়, আর তিন বছর ধরে কমিটিতে ঢোকার চেষ্টা করছে।

বটুদা চশমার ওপর দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। "কমিটির সভায় সদস্য ছাড়া কেউ কথা বলে না।"

"তাহলে আমাকে সদস্য করো।"

"সদস্য হতে গেলে অভিজ্ঞতা লাগে।"

"অভিজ্ঞতা হবে কী করে, যদি ঢুকতেই না দাও?"

"এই যে প্রশ্নটা করলি," বটুদা প্রসন্ন মুখে বললেন, "এতেই বোঝা যাচ্ছে অভিজ্ঞতা হয়নি। অভিজ্ঞ লোক জানে, কমিটিতে ঢোকার প্রশ্ন করতে নেই, অপেক্ষা করতে হয়। যা, মোড় থেকে তিরিশটা ডিম নিয়ে আয়, খিচুড়ি হবে।"

টুবাই ডিম আনতে গেল। তবে সেদিন সন্ধেবেলা সে আরও একটা জিনিস করল, যেটা ডিমের চেয়ে অনেক বেশি গোলমেলে।

সে-কথায় পরে আসছি।


তিন ॥ পৃষ্ঠপোষক

ভাদ্রের গোড়ায় নবজাগরণ সংঘের ভাগ্যাকাশে উদয় হলেন মাখনলাল দাঁ।

মাখনলালবাবু প্রোমোটার: পাড়ায় পাড়ায় পুরনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট তোলেন, আর সেই ফ্ল্যাটের নাম রাখেন ভাঙা বাড়িটার স্মৃতিতে: "হেরিটেজ এনক্লেভ", "ঐতিহ্য টাওয়ার্স"। লোকে বলত, মাখনবাবু আসলে শ্রাদ্ধের ব্যবসা করেন: আগে বাড়িটা মারেন, তারপর তার নামে মার্বেল ফলক বসান।

তা সেই মাখনলাল এক সন্ধেয় ক্লাবঘরে এলেন, সঙ্গে দু'জন লোক আর একটা চামড়ার ব্যাগ। বললেন, "বটুদা, এ-পাড়ায় আমার শিকড়। ছেলেবেলায় এই ক্লাবের মাঠে ডাংগুলি খেলেছি।" (তথ্যটা ভুল: তিনি খেলেছিলেন কেষ্ট মল্লিক রো-র মাঠে, কিন্তু শিকড় জিনিসটা প্রোমোটারদের হাতে এমনিতেই নমনীয়।) "এবার পুজোয় আমি আছি। পুরোটা।"

ব্যাগ খুলল। কমিটির ঊনত্রিশ জোড়া চোখ প্রথমবার এক বিন্দুতে স্থির হল। নগদ বারো লাখ।

নরহরিবাবু কাঁপা গলায় বললেন, "রসিদ... রসিদ কার নামে হবে?"

"রসিদ?" মাখনলাল এমনভাবে হাসলেন যেন শব্দটা বহুদিন পর শুনলেন। "দাদা, ভক্তির আবার রসিদ কী? মা কি রসিদ দেখে আশীর্বাদ করেন? তবে হ্যাঁ, খরচের বিলগুলো আমার অফিসের কেদারবাবু একটু দেখে দেবেন। উনি হিসেবের মানুষ, পুণ্যিটা যাতে ঠিক খাতে যায়।"

কেদার সোম: মাখনলালের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ছোটখাটো, নিরীহ চেহারার মানুষ; মাখনলালের যাবতীয় সংখ্যা ওঁর মাথার ভেতর দুই সারিতে সাজানো থাকত: এক সারি দেখানোর, এক সারি জানার। পাড়ার লোক ওঁকে চিনত না। চেনার কথাও নয়। হিসেবের মানুষদের নিয়তিই হল ফুটনোটে থাকা।

তবে পাঠক, নামটা মনে রাখবেন। ফুটনোট থেকেই এ-গল্পের সবচেয়ে বড় শিরোনাম বেরোবে।

সভা শেষে বটুদা ঘোষণা করলেন, "এ বছর আমাদের বাজেট আঠারো লাখ। কেষ্ট মল্লিক রো-র চোদ্দো। ভগবান সাক্ষী, আমরা ভক্তিতে ওদের চার লাখ এগিয়ে।"


চার ॥ শিল্পী সমাচার

আঠারো লাখের পুজোয় দুটো জিনিস চাই: থিম-শিল্পী আর নামী প্রতিমাশিল্পী।

থিম-শিল্পী পাওয়া গেল আর্ট কলেজ থেকে: অরিত্র সেন। ঝোলা কাঁধে, দাড়িতে দর্শন, কথায় ইনস্টলেশন। প্রথম মিটিংয়েই সে কমিটিকে চল্লিশ মিনিটের একটা বক্তৃতা দিল, যার মধ্যে "পরিসর", "বয়ান" আর "বিনির্মাণ" শব্দ তিনটে এতবার এল যে নরহরিবাবু ভাবলেন ওগুলোও বুঝি খরচের খাত। থিমের নাম ঠিক হল: "উৎস থেকে উৎসব।" মানে কী, তা অরিত্র ছাড়া কেউ বুঝল না; তবে কমিটি একমত হল যে না-বোঝাটাই আধুনিক থিমের প্রথম শর্ত। যে-থিম পাড়ার লোক বুঝে ফেলে, বিচারকরা তাকে নম্বর দেন না।

আর প্রতিমা? সে-প্রশ্নে বটুদার এক কথা: কুমোরটুলির শম্ভু পাল। "শম্ভুর হাতের চোখ যে না দেখেছে, সে মায়ের চোখই দেখেনি।"

মহালয়ার মাসখানেক আগে কমিটি গেল কুমোরটুলি। শম্ভু পালের স্টুডিওয় তখন তিলধারণের জায়গা নেই: ব্যানার, ট্রফি, বিদেশি টিভি চ্যানেলের স্টিকার, আর দেয়ালজোড়া সেই বিখ্যাত ছবিটা: শম্ভু পাল মায়ের চোখ আঁকছেন, পেছনে ভিড়ের মোবাইল ক্যামেরা।

শম্ভুবাবু পান চিবোতে চিবোতে বললেন, "ডেট নেই। একদম নেই। এ বছর আমার আটচল্লিশটা ঠাকুর।"

"আটচল্লিশ!" বটুদা হাঁ। "একা মানুষ, আটচল্লিশটা প্রতিমা গড়বেন কী করে?"

"গড়ব কে বলল?" শম্ভুবাবু শান্ত গলায় বললেন, "আমি দেখব। শিল্পী হাতে গড়ে না দাদা, চোখে গড়ে। যাক, আপনারা পুরনো লোক... ঠিক আছে, আপনাদেরটা রাখলাম। উনপঞ্চাশ।"

বায়না হল। কমিটি ধন্য হয়ে ফিরল।

তারা জানল না, জানার কথাও নয়, যে শম্ভু পালের "চোখে গড়া" ব্যবস্থাটার একটা ভূগোল আছে। আটচল্লিশ... থুড়ি, উনপঞ্চাশটা ঠাকুরের কাঠামো-মাটি-রূপ আসলে গড়া হয় শহর জুড়ে ছড়ানো গোটা ছয়েক ভাড়া-করা কারখানায়, যেখানে খাটে নাম-না-জানা তরুণ মৃৎশিল্পীর দল। শম্ভুবাবু যান শেষ দিন, চোখ আঁকতে, ক্যামেরা এলে। এবং নিয়তির এমনই পরিহাস, নবজাগরণ সংঘের প্রতিমার বরাত যে-কারখানায় গেল, সেই টিনের শেডখানার ঠিকানা:

কেষ্ট মল্লিক রো। অগ্নিবীণা ক্লাবের মাঠের ঠিক পেছনে।

কারখানাটা চালায় শম্ভুবাবুর পুরনো হাতের কারিগর, বছর ত্রিশের বিশু রুদ্রপাল। এবং কী আশ্চর্য: অগ্নিবীণা অ্যাথলেটিক ক্লাবও এ-বছর তাদের প্রতিমার বায়না দিয়েছে সস্তায়, পাড়ার ছেলে বলে, সেই বিশুকেই।

অর্থাৎ, দুই যুযুধান পাড়ার দুই দুর্গা, ঊনচল্লিশ বছরের যুদ্ধের দুই পতাকা, গড়ে উঠতে লাগল একই টিনের চালার নিচে, একই মানুষের হাতে, পাশাপাশি দুই কাঠামোয়। মাঝখানে ব্যবধান বলতে একটা বাঁশের আড়া, আর উনিশ লাখ টাকার বাজেট।

বিশু অবশ্য এ-নিয়ে মাথা ঘামাত না। তার দর্শন সরল ছিল: "মায়ের মুখ তো একটাই হয়। আলাদা হয় খালি বাজেট।"


পাঁচ ॥ ঘরশত্রু

আশ্বিন পড়তেই নবজাগরণ সংঘে অদ্ভুত সব কাণ্ড শুরু হল।

কমিটি ঠিক করল, প্যান্ডেলের গেট হবে টেরাকোটার রথের আদলে। তিন দিনের মাথায় খবর এল, অগ্নিবীণা তাদের গেটের জন্য বাঁকুড়া থেকে টেরাকোটার কারিগর আনিয়েছে। কমিটি ঠিক করল, ঢাকিদের সঙ্গে এবার ধুনুচি-নাচের ফ্ল্যাশমব হবে। পাঁচ দিনের মাথায় অগ্নিবীণার ফেসবুক পেজে ফ্ল্যাশমবের রিহার্সাল ভিডিও। এমনকি ভোগের মেনুতে যেদিন খিচুড়ির বদলে পোলাও ঠিক হল, তার পরদিনই ও-পাড়ার মাইকে ঘোষণা, "নবমীতে বাসন্তী পোলাও, সকলের নিমন্ত্রণ।"

সন্দেহ ঘনাল। বটুদা জরুরি সভা ডেকে গর্জালেন, "কমিটিতে ঘরশত্রু আছে! বিভীষণ! আমাদের প্রতিটা সিদ্ধান্ত ও-পাড়ায় পাচার হচ্ছে!"

শুরু হল গুপ্তচর-শিকার। প্রথম সন্দেহ পড়ল কেবল-লাইনের কার্তিকের ওপর। সে দুই পাড়াতেই কাজ করে। তারপর সন্দেহ হল ময়রা ভোলানাথকে। তার দোকানের রসগোল্লা ও-পাড়াতেও যায়, আর "মিষ্টির সঙ্গে খবরও তো যেতে পারে।" শেষে সন্দেহের তালিকায় উঠলেন স্বয়ং পুরুতমশাই, কারণ তিনি দুই পাড়ারই পুজো করেন, যদিও তাঁর পক্ষে সওয়াল করে ভুবনবাবু বললেন, "উনি মন্ত্র ছাড়া কিছু মুখস্থ রাখতে পারেন না, আর মন্ত্র তো দু-পাড়ায় একই।"

কমিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ভেঙে বানানো হল নতুন গ্রুপ: "নবজাগরণ (কোর)"। তার থেকেও খবর ফাঁস হতে সেটা ভেঙে হল "নবজাগরণ (কোর-এর কোর)"। শেষ গ্রুপে সদস্য রইলেন পাঁচজন, তবু খবর ফাঁস চলতেই থাকল, কারণ পাঁচজনের সভাগুলো হত ক্লাবঘরের বারান্দায়, খোলা গলায়, আর বারান্দার পাশেই টুবাইদের ঘরের জানলা।

হ্যাঁ, পাঠক। গুপ্তচর ধরার কমিটির সভাপতির বাড়িতেই গুপ্তচর: সম্পাদকের একমাত্র পুত্র।

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল সেই ডিম আনার সন্ধেয়। মোড়ের দোকানে টুবাইয়ের দেখা হয়েছিল অগ্নিবীণার কালচারাল সেক্রেটারি রনির সঙ্গে, কলেজের সিনিয়র। রনি আধ ঘণ্টা তার রিল দেখেছিল, তারপর বলেছিল, "তোর ভিশন আছে ভাই। আয় না আমাদের পুজোয়। তোকে যুগ্ম থিম-উপদেষ্টা করে দেব। পদ। কার্ডে নাম ছাপা হবে।"

একত্রিশ বছরের সম্পাদকের ছেলে, যাকে নিজের পাড়া ডিম আনতে পাঠায় আর পরের পাড়া পদ দেয়, সে কোন দিকে যাবে, এ আর এমন কী ধাঁধা? টুবাই বিশ্বাসঘাতক ছিল না; সে শুধু এমন একটা কমিটি খুঁজছিল যেখানে তার বয়সটা অযোগ্যতা নয়। বাবার সভার সিদ্ধান্তগুলো সে রনিকে ফরোয়ার্ড করত, আর প্রতিবার ফরোয়ার্ড করার সময় নিজেকে বোঝাত: এ তো পাচার নয়, এ হল প্রতিভার পুনর্বাসন।

সবচেয়ে মজার কথা, অগ্নিবীণা তার একটা থিম-প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত নেয়নি। তারা নিয়েছিল শুধু খবরগুলো। পদটা ছিল, কার্ডে নামও ছাপা হয়েছিল। কাজ ছিল না। এ-জিনিস অবশ্য টুবাইয়ের নিজের পাড়াতেও ছিল; তফাত এই যে, নিজের পাড়ায় কার্ডে নামটাও ছিল না।


ছয় ॥ মধ্যরাতের রাজমিস্ত্রি

চতুর্থীর দিন দুপুরে মাখনলাল দাঁ-র অফিসে একটা ফোন এল, এবং ফোনটা ধরার পর মাখনবাবুর মুখ থেকে পানের রংটুকুও উবে গেল।

খবর: ওঁর ব্যবসায় "দপ্তরের নজর" পড়েছে। কোন দপ্তর, তা এ-গল্পে খোলসা করা হবে না; শুধু এটুকু বলা যায়, সে-দপ্তরের লোকজন ক্যালেন্ডার দেখে আসে না এবং এলে চা খেয়ে ফেরে না, খাতা নিয়ে ফেরে।

মাখনলালের প্রথম চিন্তা তাঁর অফিসের সিন্দুক নয়। সিন্দুক দেখানোর জন্যই থাকে। চিন্তা হল সেই নগদটুকু নিয়ে, যেটা কোনো খাতায় নেই, অথচ আছে। হিসেবের ভাষায় "নেই-টাকা"। নেই-টাকার একটাই ধর্ম: তাকে থাকতে হয় এমন জায়গায়, যেখানে কেউ খোঁজে না।

সেই রাতে, পঞ্চমীর ভোররাতে, নবজাগরণ সংঘের প্যান্ডেল চত্বরে একটা ছোট ম্যাটাডোর ঢুকল। নামলেন কেদার সোম, সঙ্গে মাখনলালের বিশ্বস্ত রাজমিস্ত্রি রামখেলাওন আর কয়েকটা টিনের ট্রাংক। প্রতিমার বেদিটা তখনো আধা-গাঁথা। ইট, বালি, সিমেন্টের কাজ চলছে। ভোরের আলো ফোটার আগে বেদির ভেতরের ফাঁপা খোপে ঢুকে গেল পলিথিনে মোড়া বেশ কয়েকটি নিরেট বান্ডিল, আর তার ওপর পড়ল সিমেন্টের প্রলেপ।

কেদারবাবু কাজ মিলিয়ে নিয়ে খাতায় লিখলেন, অবশ্যই মনের খাতায়: "বেদি বাবদ: বারো। উদ্ধার: বিসর্জনের পর, ঘাটে। কাঠামো-সেবার আড়ালে।"

পরিকল্পনাটা নিখুঁত। কোন রেইডের সাহস হবে মা দুর্গার বেদি ভাঙার? চারদিন টাকা পাহারা দেবেন স্বয়ং দশভুজা, দশ হাতে, ত্রিশূল সমেত। পৃথিবীর কোনো ভল্টের এমন নিরাপত্তা নেই। আর বিসর্জনের রাতে, ঘাটে, মাখনলালের নিজস্ব ডুবুরির দল তো প্রতি বছরই নামে। "কাঠামো তুলে গঙ্গা পরিষ্কার রাখা" মাখনবাবুর বিখ্যাত সমাজসেবা; কাগজে ছবিও ছাপা হয়। এ-বছর সেবাটা শুধু একটু গভীরে যাবে।

ভক্তি আর কালো টাকার এমন নিটোল মিলন, গঙ্গাসাগরেও হয় না।

কিন্তু ওই যে দপ্তরের নজর, তার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল। মাখনলাল সমস্ত পেমেন্ট বন্ধ করলেন; নগদে চলা মানুষ নজরে পড়লে পাথরে চলে। এবং পেমেন্ট বন্ধ হতেই থিম-শিল্পী অরিত্র সেন, যার "উৎস থেকে উৎসব"-এর কাজ তখন সবে অর্ধেক (বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়েছে, প্লাস্টার অর্ধসমাপ্ত, টিন-চাটাই-সিমেন্টের বস্তা যেখানে-সেখানে) সে দুই রাতের মধ্যে তার দলবল নিয়ে অন্তর্হিত হল। যাওয়ার আগে ক্লাবের দেয়ালে চক দিয়ে লিখে গেল: "শিল্পীরও উৎস লাগে। পারিশ্রমিক পেলে উৎসবে ফিরব।"

ষষ্ঠীর সকালে কমিটি প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে। আঠারো লাখের পুজোর অবস্থা: প্রতিমা এসে গেছে (বিশুর কারখানা কথা রেখেছে), কিন্তু মণ্ডপ বলতে অর্ধেক-প্লাস্টার-করা এক কঙ্কাল: কাঁচা বাঁশ, ঝুলন্ত চাটাই, সিমেন্টের বস্তার স্তূপ, আর দেয়ালময় সাঁটা টিনের পাতে তখনো লেগে থাকা দোকানের স্টিকার আর দাম-লেখা লেবেল।

নরহরিবাবু প্রায় কেঁদে ফেললেন, "সর্বনাশ হয়ে গেছে বটুদা। লোকে কী বলবে?"

বটুদা অনেকক্ষণ চুপ করে কঙ্কালটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। একত্রিশ বছরের সম্পাদক-জীবন মানুষকে একটা জিনিস শেখায়: পরিস্থিতি বদলানো যায় না, কিন্তু বিবৃতি বদলানো যায়।

তিনি ধীর গলায় বললেন, "কে বলল অসমাপ্ত? লেখ। ব্যানার ছাপতে দে। থিমের নাম বদলে গেছে।"

"নতুন নাম?"

বটুদা সিমেন্টের বস্তার স্তূপ, ঝুলন্ত দামের লেবেল আর ন্যাংটো বাঁশের দিকে শেষবার তাকালেন। তারপর উচ্চারণ করলেন সেই নাম, যা এ-গল্পের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেবে:

"নির্মাণ: ভোগবাদের কঙ্কাল।"


সাত ॥ বিচার

সপ্তমীর বিকেলে এল বিচারকমণ্ডলী: "বিভা শারদ সম্মান"-এর জুরি। শহরের সবচেয়ে দামি পুজো-পুরস্কার; স্পনসর এক বহুজাতিক রং কোম্পানি, আর মিডিয়া পার্টনার তিনটে চ্যানেল।

জুরির গাড়ি থেকে নামলেন এক চিত্রপরিচালক, এক নৃতত্ত্বের অধ্যাপিকা, এক আর্ট গ্যালারির কিউরেটর, এবং জুরি-চেয়ারম্যান, ছোটখাটো, নিরীহ চেহারার এক ভদ্রলোক, যাঁকে দেখে পাড়ার কারো কিছু মনে পড়ল না।

কেদার সোম।

হ্যাঁ। মাখনলাল দাঁ-র চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। যিনি রং কোম্পানিটির "ট্যাক্স কনসালট্যান্ট"-ও বটে, এবং সেই সূত্রে গত চার বছর ধরে বিভা শারদ সম্মানের জুরি-চেয়ারম্যান। সংখ্যার মানুষদের এই এক ক্ষমতা: তাঁরা সব দরজার পেছনেই থাকেন, কারণ প্রতিটি দরজার একটা করে হিসেব আছে।

কেদারবাবু প্যান্ডেলে ঢুকলেন এবং এক পলকে বুঝলেন: বেদির খোপ অক্ষত, প্লাস্টার শুকিয়েছে, চারদিন নিশ্চিন্ত। ব্যস, তাঁর পরিদর্শনের আসল উদ্দেশ্য সমাপ্ত। এবার পুরস্কারটা এখানে নামিয়ে আনতে পারলে ষোলোকলা পূর্ণ। পুরস্কৃত পুজোর হিসেবে কেউ হাত দেয় না, আর মাখনলালের বারো লাখ "দান" তখন কাগজে-কলমে হয়ে যায় দূরদর্শী সমাজসেবা। পুরস্কার জিনিসটা আসলে হোয়াইটনার: যে-খাতায় পড়ে, সে-খাতা সাদা।

কিন্তু কেদারবাবুকে বিশেষ খাটতেই হল না। কারণ বাকি তিন বিচারক ততক্ষণে অর্ধসমাপ্ত মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় সমাধিস্থ।

কিউরেটর ভদ্রলোক ন্যাংটো বাঁশের কাঠামোর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বললেন, "আনফিনিশড... ডেলিবারেটলি আনফিনিশড। ভেনিসে এবার এই ভাষাটাই ঘুরছিল।"

অধ্যাপিকা টিনের পাতে ঝুলন্ত দামের লেবেলগুলো ছুঁয়ে বললেন, "প্রাইস ট্যাগগুলো রেখে দিয়েছে! উৎসবের গায়ে বাজারের বারকোড। এ তো সরাসরি ভোগবাদের বিনির্মাণ!"

চিত্রপরিচালক সিমেন্টের বস্তার স্তূপের সামনে দুই মিনিট নীরব দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, "এই স্তূপটা... এটা আমাদের সবার ভেতরের অসমাপ্ত ফ্ল্যাটবাড়ি। আমি... আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।"

বটুদা পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ছিলেন, সম্মতিতে, এবং সাবধানে। একত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, যখন লোকে নিজে থেকে ঠকছে, তখন সাহায্য করতে যেতে নেই; হাত লাগালেই দাগ থেকে যায়।

শুধু একবার, কিউরেটর যখন জিজ্ঞেস করলেন, "শিল্পী কোথায়? ওঁর সঙ্গে কথা বলা যায়?", বটুদা উদাস চোখে দূরে তাকিয়ে বললেন, "শিল্পী বলেছেন, নির্মাণ যেখানে অসমাপ্ত, নির্মাতার সেখানে উপস্থিত থাকতে নেই।"

কথাটা অরিত্রর চকে-লেখা নোটিশের সম্পাদিত সংস্করণ; সম্পাদনা সম্পাদকেরই কাজ।

নবমীর সকালে ফল বেরোল। বিভা শারদ সম্মান, সেরা ভাবনা: নবজাগরণ সংঘ, "নির্মাণ: ভোগবাদের কঙ্কাল।" জুরির মন্তব্য, তিন চ্যানেলে পঠিত: "উৎসবের আড়ম্বরের বিরুদ্ধে এমন সাহসী, ব্যয়সংকোচী, আপসহীন শিল্পভাষা এ-শহর বহুদিন দেখেনি।"

"ব্যয়সংকোচী" শব্দটার জায়গায় নরহরিবাবুর একবার হেঁচকি উঠেছিল, তবে সামলে নিয়েছিলেন।

আর কেষ্ট মল্লিক রো? তারাও খালি হাতে ফেরেনি। পুরস্কারের বাজারে ততদিনে ক্যাটেগরির সংখ্যা প্যান্ডেলের সংখ্যাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। অগ্নিবীণা পেল অন্য এক চ্যানেলের "সেরা পরিবেশ-বান্ধব উদ্যোগ" সম্মান, মূলত জেনারেটরের পাশে তুলসীগাছ রাখার জন্য। শহরের প্রতিটি কমিটিই পুজোর শেষে কিছু-না-কিছু "সেরা"; পুরস্কার এখন প্রসাদের মতো: লাইনে দাঁড়ালেই মেলে।


আট ॥ ঘাট

দশমীর রাত। নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা।

নবজাগরণ সংঘ চলেছে দক্ষিণ দিক দিয়ে, পুরস্কারজয়ী পুজোর যা প্রাপ্য: ব্যান্ড, ঢাকের সারি, ট্যাবলো, আর ট্রাকের সামনে "বিভা শারদ সম্মান বিজয়ী" ফ্লেক্স। অগ্নিবীণা চলেছে উত্তরের রাস্তায়, সমান জাঁকে। দুই মিছিলের রুট আলাদা করাই ছিল। পুলিশ, পুরসভা, দুই কমিটি, সবাই জানত ঊনচল্লিশ বছরের শত্রুদের এক রাস্তায় ফেলা আর দেশলাই-পেট্রল একসঙ্গে রাখা সমান।

কিন্তু নিয়তির নিজস্ব রুট-ম্যাপ থাকে। মাঝপথে একটা জলের পাইপ ফেটে উত্তরের রাস্তা বন্ধ; পুলিশ অগ্নিবীণার মিছিল ঘুরিয়ে দিল দক্ষিণে। এবং রাত এগারোটা বেজে কুড়ি মিনিটে, গঙ্গার ঘাটের মুখে, মুখোমুখি এসে দাঁড়াল দুই ট্রাক: দুই পাড়ার দুই প্রতিমা, পরস্পরের দিকে ফেরানো।

দুই মিছিল থমকাল। ঢাক থামল। স্লোগান মরে এল। এবং আলোয়-ভাসা ঘাটের মুখে, শত শত মানুষ, দুই কমিটি, তিনটে চ্যানেলের ক্যামেরা, সবাই একই জিনিস দেখল, একই মুহূর্তে।

দুটো মুখ। হুবহু এক।

একই টানা চোখ, একই ভুরুর বাঁক, চিবুকের একই তিলটুকু পর্যন্ত: আয়নার এপার-ওপার। শাড়ির রং আলাদা, গয়না আলাদা, চালচিত্র আলাদা, কিন্তু মা এক। অবিকল, অস্বীকার-অযোগ্য, এক।

এক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপর দুই পাড়া থেকে একই সঙ্গে গর্জন উঠল, "ওরা আমাদের মুখ টুকেছে!", এবং যেহেতু অভিযোগটা দুই দিক থেকে অভিন্ন শব্দে উঠল, সেটা নিজেই নিজেকে বাতিল করে দিল। টোকাটুকির মামলায় দুই পক্ষের খাতা এক হলে দোষী খুঁজতে হয় তৃতীয় খাতায়।

তৃতীয় খাতাটা ভিড়ের মধ্যেই ছিল। বিশু রুদ্রপাল, দুই ঠাকুরেরই কারিগর, কেষ্ট মল্লিক রো-র বাসিন্দা হিসেবে নিজের পাড়ার মিছিলে হাঁটছিল। দুই কমিটির মাঝখানে পড়ে ছেলেটা প্রথমে পালানোর কথা ভেবেছিল; তারপর কী মনে হল, ট্রাকের চাকায় উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলল।

"চেঁচাবেন না। দুটোই আমার গড়া।"

"তোর গড়া মানে?" বটুদা ফেটে পড়লেন। "আমাদেরটা শম্ভু পালের! উনপঞ্চাশ হাজার—"

"শম্ভুদা চোখ এঁকেছেন," বিশু শান্ত গলায় বলল, "অষ্টমীর আগের রাতে, এগারো মিনিটে, দু'জোড়া। বাকি মূর্তি আমার আর আমার লোকেদের, আমার কারখানায়, ওই যে, অগ্নিবীণার মাঠের পেছনের শেড। দুই কমিটির কাঠামো পাশাপাশি বাঁধা ছিল, দেড় হাত তফাতে। আপনারা ঊনচল্লিশ বছর যে-যুদ্ধ করছেন, আপনাদের দুই মা সেই পুরো শরৎকালটা এক ঘরে, এক মশারির নিচে কাটিয়েছেন।"

ভিড় নিঃশব্দ। তিনটে ক্যামেরা জুম করছে। কোথাও একটা ঢাকের কাঠি হাত ফসকে পড়ে গেল।

"আর মুখ এক কেন," বিশু গলাটা একটু নামাল, যেন কথাটা শুধু দুই কমিটিকেই বলছে, "সে-প্রশ্নের উত্তরটা আপনারা আসলে জানেন। ছাঁচ আলাদা করার পয়সা দুই কমিটির কেউ দেননি। এক পক্ষ দর কষেছেন পাড়ার ছেলে বলে, অন্য পক্ষের বাজেট মার্কামারা নামের বায়নাতেই শেষ। তা ছাড়া..." সে দুই প্রতিমার মুখের দিকে তাকাল, "মায়ের মুখ তো একটাই হয়, দাদা। আলাদা হয় শুধু বাজেট।"

ঠিক এই মুহূর্তে ভিড়ের পেছন থেকে রনির গলা পাওয়া গেল। অগ্নিবীণার কালচারাল সেক্রেটারি নাটক বোঝে, আর নাটকের ক্লাইম্যাক্সে নিজের সংলাপ গুঁজে দেওয়ার লোভ সামলানো তার কম্ম নয়, "তাই তো বলি! এদের রথের গেট, ফ্ল্যাশমব, পোলাও, সব খবর তো আমরা টুবাইয়ের থেকেই... "

গলাটা মাঝপথে থেমে গেল, কিন্তু যা বেরোনোর বেরিয়ে গেছে। বটুদা খুব ধীরে ঘুরলেন। মিছিলের ভিড়ে, ধুনুচি-নাচের দলের ঠিক পাশে, মোবাইলে রিল তুলতে-থাকা টুবাই স্থির হয়ে গেছে।

বাপ-ছেলের চোখাচোখি হল। ঊনত্রিশ জনের কমিটি, দুই পাড়ার জনতা আর তিনটে চ্যানেলের সামনে বটুকেশ্বর ঘোষ টের পেলেন: ঘরশত্রু-তত্ত্বে তিনি ঠিকই ছিলেন, শুধু "ঘর" শব্দটাকে এতটা আক্ষরিক ভাবেননি।

কিন্তু ওই যে বলে, বড় গোলমাল ছোট গোলমালকে খেয়ে ফেলে। যে-পাড়ার হাতে-গরম কেলেঙ্কারি হল "দুই শত্রুর এক ঠাকুর", সে-পাড়ায় "সম্পাদকের ছেলে খবর পাচার করত" নিতান্ত পাতার তলার খবর। তা ছাড়া হিসেব কষলে দাঁড়ায়, টুবাই যা-যা পাচার করেছে, সবই দুই পাড়ার সাধারণ সম্পত্তি হয়ে গেছে: গেটের নকশা থেকে পোলাওয়ের মেনু, এমনকি মায়ের মুখখানা পর্যন্ত। যে-যুদ্ধে দুই পক্ষের সমস্ত গোপন তথ্য অভিন্ন, সে-যুদ্ধে গুপ্তচরের চাকরিটাই অবলুপ্ত।


নয় ॥ নিরঞ্জন

শেষ পর্যন্ত সমাধানটা দিলেন ঘাটের বৃদ্ধ পুরোহিত, যিনি দুই পাড়ারই নিরঞ্জন করান বছর চল্লিশ ধরে।

"এক মায়ের দুই রূপ যখন এক ঘাটে এসেই পড়েছে, তখন আলাদা বিসর্জন অকল্যাণের। দুই প্রতিমা জলে যাবে পাশাপাশি, এক লগ্নে। যার যার ঢাক, তার তার কান্না, কিন্তু মা নামবেন একসঙ্গে।"

আপত্তির চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। কিন্তু তিন ক্যামেরার সামনে ধর্মীয় নির্দেশ অমান্য করার সাহস কোন কমিটির থাকে? তাছাড়া ততক্ষণে দুই পাড়ার মেয়েরা সিঁদুরখেলা মিশিয়ে ফেলেছেন। মায়ের মুখ এক দেখার পর কোন সিঁদুর কোন পাড়ার, সে-প্রশ্ন তাঁদের কাছে অবান্তর ঠেকেছে।

অতএব রাত সাড়ে বারোটায়, ফ্লাডলাইটের আলোয়, গঙ্গায় নামল দুই অভিন্ন দুর্গা: পাশাপাশি, এক ঢেউয়ে। ঊনচল্লিশ বছরের যুদ্ধের দুই পতাকা এক জলে মিলিয়ে গেল, আর পাড়ে দাঁড়িয়ে দুই পাড়া আবিষ্কার করল, বিসর্জনের কান্নাটাও তাদের একই সুরে বাঁধা।

চ্যানেলের সাংবাদিকরা ততক্ষণে লাইভে ঢুকে পড়েছেন, "ঐতিহাসিক সম্প্রীতি! ঊনচল্লিশ বছরের শত্রুতার নিরঞ্জন!" পরদিন কাগজে ছবিসহ খবর: দুই সম্পাদকের করমর্দন (দু'জনের মুখই ছবিতে এমন, যেন দাঁতের ডাক্তারের চেয়ারে বসে আছেন)। এক সম্পাদকীয়তে প্রস্তাব উঠল যুগ্ম পুজোর। প্রস্তাবটা দুই কমিটির যৌথ সভায় পাঠানো হল, এবং যৌথ সভার প্রথম বৈঠকেই স্থির হল, বিষয়টি গভীর বিবেচনার দাবি রাখে বলে একটি যুগ্ম সাব-কমিটি গঠিত হোক। প্রস্তাবটি আজও সেই সাব-কমিটিতে সসম্মানে জীবিত, এবং সকলেই জানে, কমিটির যত্নে কোনো প্রস্তাব মরে না, শুধু জন্মায় না।

আর সেই ভিড়ে-ঠাসা, আলোয়-ধোয়া ঘাটে সেদিন রাতে আরও একটা জিনিস ঘটেছিল, যেটা কোনো ক্যামেরায় ওঠেনি।

দুই প্রতিমা জলে পড়ার মিনিট দশেকের মধ্যে, "কাঠামো-সেবা"-র ব্যানার-লাগানো নৌকো থেকে জলে নেমেছিল মাখনলাল দাঁ-র ডুবুরির দল, প্রতি বছরের মতো, খবরের কাগজের চেনা সমাজসেবা। তারা কাঠামো তুলল, খড় তুলল, ফুল-মালা তুলল। তারপর ডুবল আরও গভীরে, বেদির ভাঙা চাঁইয়ের খোঁজে, যেটা শোভাযাত্রার আগে ভেঙে ট্রাকেই তোলা হয়েছিল এবং প্রতিমার সঙ্গেই জলে গেছে।

চাঁই উঠল। পাড়ে, ত্রিপলের আড়ালে, শাবলের দুই ঘায়ে খুলল সিমেন্টের খোপ। ভেতরে, পলিথিনের মোড়কে, চারদিন দশভুজার পাহারায় থাকা বান্ডিলগুলো: অক্ষত, শুকনো, এবং হিসেবমতো।

কেদার সোম টর্চের আলোয় গুনে নিলেন। মেলাতে মেলাতে ওঁর মনে একবার প্রশ্ন এল: এই যে টাকাটা চারদিন মায়ের আসনের নিচে শুয়ে রইল, পুরুত এর ওপর দিয়ে এত মন্ত্র পড়লেন, এত ধুনোর ধোঁয়া গেল, এর পরেও কি একে "কালো" বলা চলে? নাকি এ-ও এক রকমের শুদ্ধিকরণ হল?

হিসেবের মানুষ প্রশ্নটা বেশিক্ষণ পোষেণ না। কেদারবাবু বান্ডিল ব্যাগে ভরলেন আর খাতার, মনের খাতার, পাতা উল্টে লিখলেন: "নিরঞ্জন সম্পূর্ণ। প্রাপ্তি: বারো। অতিরিক্ত প্রাপ্তি: এক জোড়া পুরস্কার, তিন চ্যানেলের সুনাম, ও আগামী বছরের আমন্ত্রণ, উভয় কমিটির।"

হ্যাঁ, উভয় কমিটির। কারণ ঘাটের সেই ঐতিহাসিক রাতেই, কান্নাকাটির ফাঁকে, অগ্নিবীণার সভাপতি মাখনলাল দাঁ-র হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, "মাখনদা, সামনের বছর আমাদের দিকটাও একটু দেখবেন। আপনার মতো ভক্ত ক'টা আছে বলুন?"

মাখনলাল উদার হাসি হেসেছিলেন। মনে মনে ভেবেছিলেন: দু'পাড়ায় দুটো বেদি মানে ডবল ভল্ট। ভক্তির পরিকাঠামোয় এমন সম্প্রসারণের সুযোগ প্রোমোটার ছাড়ে না।

আর ভাসান-ঘাট থেকে ফেরার পথে, ফাঁকা রাস্তায়, বটুকেশ্বর ঘোষ ছেলের কাঁধে প্রথমবার হাতটা রাখলেন। অনেকক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর শুধু বললেন, "সামনের বছর থেকে কমিটির মিটিংয়ে বসবি। ভেতরে বসে যা করার করিস। অন্তত খবরটা পাড়াতেই থাকবে।"

উত্তর কলকাতায় ক্ষমা এই ভাষাতেই হয়। এবং নিয়োগও।

মা ফিরে গেলেন কৈলাসে, সম্ভবত এই ভেবে যে, তাঁর দুটো মুখই যখন এক, তখন এতগুলো কমিটির আলাদা আলাদা দরকারটা ঠিক কী। প্রশ্নটার উত্তর অবশ্য মর্ত্যে সবাই জানে।

মায়ের জন্য কমিটি লাগে না। কমিটির জন্য মা লাগে।

আসছে বছর, আবার হবে।

॥ সমাপ্ত ॥

Leave a comment

No account needed. Leave the name blank and you'll get a random one.

0/2000
By email

Get the next one in your inbox.

Engineering post-mortems, mathematics, and short fiction, in English and Bengali. Infrequent by design: an email only when there is something new worth reading, never on a schedule. One click to leave, any time.

Double opt-in: you'll get one email to confirm, and nothing else until you do.